কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জেনারেটিভ এআই এখন পড়াশোনা, গবেষণা, লেখালেখি ও পেশাগত কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, গবেষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ—অনেকেই দৈনন্দিন কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তবে এর সঙ্গে বাড়ছে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, শিক্ষাক্ষেত্রে সততা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিয়ে নানা প্রশ্ন।
এআই থেকে পাওয়া তথ্য কতটা সঠিক, ভুল তথ্য কীভাবে শনাক্ত করা যায় এবং এআইয়ের সহায়তায় তৈরি কোনো কাজের দায় কে নেবেন—এসব বিষয় সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা চালু করেছে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। ‘ইউএ আই এক্সপেরিয়েন্স’ (UA AI Experience) নামের এই অনলাইন কোর্সটি বিনামূল্যে করা যায়। কোর্সটি সম্পন্ন করতে আনুমানিক তিন ঘণ্টা সময় লাগে এবং অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের সুবিধামতো সময়ে এটি শেষ করতে পারেন। এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য শুধু এআই ব্যবহার শেখানো নয়, বরং এআইয়ের তৈরি তথ্য যাচাই করা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তিটি ব্যবহারের দক্ষতা গড়ে তোলা।
বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এআই বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ
ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার অফিস অব টিচিং ইনোভেশন অ্যান্ড ডিজিটাল এডুকেশন এবং ইউএ টিচিং একাডেমির যৌথ উদ্যোগে কোর্সটি তৈরি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো শিক্ষাঙ্গনের জন্য এটি চালু করা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের জন্য এই প্রশিক্ষণ উন্মুক্ত। কোর্সটিতে মোট পাঁচটি মডিউল রয়েছে। প্রথম চারটি মডিউলে এআই ব্যবহারের মৌলিক দক্ষতা শেখানো হয়। পঞ্চম মডিউলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের পছন্দের একটি শিক্ষণপথ বেছে নিয়ে বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ পান। এতে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবহারিক অনুশীলন, এআইয়ের তৈরি নমুনা উত্তর বিশ্লেষণ এবং সেগুলোর মান যাচাইয়ের কার্যক্রম। কোনো উত্তর শিক্ষাগত বা পেশাগত কাজে ব্যবহার করার উপযোগী কি না, তা বিচার করতে শেখানো হয় অংশগ্রহণকারীদের।
দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের চারটি মূলনীতি
এই প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ফোর-ডি মডেল’ বা 4D Model। এর চারটি ধাপ হলো—Discern, Direct, Double Check এবং Defend।
প্রথম ধাপ—Discern: কোনো কাজে এআই ব্যবহার করা আদৌ প্রয়োজন কি না এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি কী, তা আগে বিবেচনা করা।
দ্বিতীয় ধাপ—Direct: এআইকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরা, যাতে প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর উত্তর পাওয়া যায়।
তৃতীয় ধাপ—Double Check: এআইয়ের দেওয়া তথ্য, পরিসংখ্যান, যুক্তি ও সূত্র যাচাই করা। পাশাপাশি কোনো ধরনের পক্ষপাত বা ভুল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।
চতুর্থ ধাপ—Defend: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি কাজ সম্পর্কে নিজের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে পারা এবং সেই কাজের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা। এই মডেলের মূল বক্তব্য হলো, এআই মানুষের চিন্তাশক্তিকে সহায়তা করবে, তার জায়গা দখল করবে না। তাই এআইয়ের উত্তর পেলেই সেটিকে সঠিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কোনো কাজে ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহারের আগে সেগুলো বাদ দেওয়া প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।
সুন্দরভাবে লেখা মানেই সঠিক তথ্য নয়
প্রশিক্ষণটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, এআই অনেক সময় এমনভাবে উত্তর তৈরি করে, যা পড়তে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কিন্তু ভাষা সুন্দর ও যুক্তিসংগত হলেই তথ্য সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এআইয়ের দেওয়া সূত্র, গবেষণার তথ্য কিংবা পরিসংখ্যান ব্যবহারের আগে মূল উৎস থেকে সেগুলো যাচাই করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোর্সের একটি ব্যবহারিক উদাহরণে বলা হয়, কোনো গবেষণায় দেখা গেছে—শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে শেখার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের তথ্য মনে রাখার সম্ভাবনা ২ দশমিক ৪ গুণ বেশি হয়। অংশগ্রহণকারীদের এই দাবির পেছনে সত্যিই কোনো গবেষণা রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণার ফলাফল দাবিটিকে সমর্থন করে কি না, তা যাচাই করতে বলা হয়। অর্থাৎ, শুধু এআইয়ের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে মূল গবেষণা খুঁজে বের করা এবং প্রমাণ পরীক্ষা করাই দায়িত্বশীল ব্যবহারের অংশ।
এআইয়ের উত্তরে পক্ষপাত থাকতে পারে
এআইয়ের তৈরি উত্তরে পক্ষপাত কিংবা যুক্তিগত ভুল থাকার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে এই প্রশিক্ষণে। একটি অনুশীলনে অংশগ্রহণকারীদের একজন সফল উদ্যোক্তা সম্পর্কে লিখতে বলা হয়। পরে নির্দেশনায় পরিবর্তন এনে উদ্যোক্তাকে গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা অথবা অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নির্দেশনার এই পরিবর্তনে এআইয়ের উত্তরের ধরন কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা বিশ্লেষণ করতে বলা হয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, প্রশ্ন কীভাবে করা হচ্ছে, তার ওপর এআইয়ের উত্তর নির্ভর করতে পারে। তাই কোনো উত্তর মূল্যায়নের সময় বাদ পড়ে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি, একপেশে বর্ণনা এবং অসমর্থিত ধারণা রয়েছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
বাস্তব কাজের মাধ্যমে দক্ষতা যাচাই
কোর্সের পঞ্চম মডিউলে পেশাগত ইমেইল, প্রকল্পের তালিকা, সভার সারসংক্ষেপ, শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা, অনুশীলনী প্রশ্ন এবং বিভিন্ন ধরনের লেখার ওপর কাজ করার সুযোগ রয়েছে। একটি অনুশীলনে সভার আলোচনার ভিত্তিতে সারসংক্ষেপ তৈরি করতে হয়। সেখানে প্রকল্প চালু করা, প্রশিক্ষণ, ওয়েবসাইট এবং প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা থাকলেও কিছু বিষয় তখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং কারও দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে এআইয়ের তৈরি সারসংক্ষেপে অনিশ্চিত প্রস্তাবকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হয়। একই সঙ্গে অসমর্থিত অনুমান, অনুপস্থিত তথ্য এবং যেসব দায়িত্ব আসলে কাউকে দেওয়া হয়নি, সেগুলো শনাক্ত করাও এই অনুশীলনের অংশ।
লেখালেখির ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়। কোনো অনুচ্ছেদের ভাষা উন্নত করতে গিয়ে মূল লেখকের বক্তব্য বা অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে বলা হয়। কারণ, লেখা আরও সুন্দর হয়ে উঠলেও মূল বক্তব্য বদলে গেলে সেটিকে সফল সম্পাদনা বলা যায় না। সবশেষে অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হয়—এআইয়ের সহায়তায় তৈরি এই কাজের পাশে নিজের নাম দিতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন কি না। এর মাধ্যমে তথ্য যাচাই, নিজস্ব বিচারবোধ এবং ব্যক্তিগত জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে ডিজিটাল স্বীকৃতি
অংশগ্রহণকারীদের অগ্রগতি ও অর্জন স্বীকৃতি দিতে কোর্সটিতে ডিজিটাল ব্যাজের ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি মূল দক্ষতার জন্য দেওয়া হয় ‘Discernment Certified’, ‘Director’s Cut’, ‘Verification Pro’ এবং ‘Defender of the Standard’ নামের ব্যাজ। কোর্স সম্পন্নের আনুষ্ঠানিক ব্যাজ পেতে প্রথম চারটি মডিউল এবং পঞ্চম মডিউলের নির্ধারিত একটি শিক্ষণপথ সম্পন্ন করতে হয়। এসব ব্যাজ অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের পেশাগত নেটওয়ার্কেও শেয়ার করতে পারেন।
ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, বাংলাদেশের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার কামরুল হাসান ২০২৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর কোর্সটির কার্যক্রম সম্পন্ন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্জনের ব্যাজ লাভ করেন। শিক্ষাদান ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি কোর্সের তথ্যসূত্র যাচাই, যুক্তি বিশ্লেষণ, পক্ষপাত শনাক্তকরণ এবং জবাবদিহি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, গবেষণা, পাঠদান কিংবা একাডেমিক প্রকাশনায় এআইয়ের তৈরি তথ্য ব্যবহারের আগে তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নিতে পারে শিক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের এআই ব্যবহারে সচেতন করতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের কর্মসূচি চালু করার ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই প্রশিক্ষণ সব প্রতিষ্ঠানের জন্য হুবহু কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষার্থীদের গবেষণার তথ্য যাচাই, শিক্ষকদের এআই-সহায়তায় তৈরি লেখার মান মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক কাজে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এই চার ধাপের মডেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স করলেই দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের দক্ষতা স্থায়ীভাবে তৈরি হবে না। এর জন্য নিয়মিত অনুশীলন, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানাই যথেষ্ট নয়। এআইয়ের দেওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, কোথায় ভুল থাকতে পারে এবং নিজের কাজের জন্য কীভাবে দায়িত্ব নিতে হবে—সেই বোধ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক পরিচিতি: ড. খন্দকার কামরুল হাসান ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, বাংলাদেশের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ভারতের ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় প্রথম পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার কলেজ অব এডুকেশনে উচ্চশিক্ষা বিষয়ে দ্বিতীয় পিএইচডি করছেন। ২০২৬ সালের অক্টোবরে তিনি ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার ‘UA AI Experience’ কোর্সটি সম্পন্ন করেন।